
ইসলামে সুদ
ইসলামে সুদকে "রিবা" বলা হয়। সুদকে ইংরেজিতে ইন্টারেস্ট (interest) বা ইউজারি (usury) বলে। ‘রিবা’ অর্থ বেশি হওয়া, বৃদ্ধি পাওয়া, ইত্যাদি। ইসলামের শরীয়তের পরিভাষায়, ঋণের উপর অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা, যা ঋণদানকারী ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য আদায় করে অথবা এক মালের বদলে অন্য মালের আদান-প্রদানকালে অতিরিক্ত মাল নেয়, তাকে সুদ বলা হয়।
ইসলামে সুদ হারাম। মহান আল্লাহ সুদকে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করেছেন এবং সুদ গ্রহীতা ও প্রদানকারী উভয়ের জন্যই কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করেছেন। অন্যদিকে, ব্যবসা হালাল, যদি তা নীতিশাস্ত্র ও ন্যায়বিচারের নীতি মেনে পরিচালিত হয়।
সুদের প্রকারভেদ
ইসলামে সুদের দুটি প্রধান প্রকারভেদ রয়েছে: (ক) রিবা আন-নাসি'আ এবং (খ) রিবা আল ফাদল।
(ক) রিবা আন-নাসি'আ :
এটি সরাসরি সুদ যা ঋণের উপর নির্দিষ্ট মেয়াদকালে নির্দিষ্ট হারে অতিরিক্ত অর্থ আদায়কে বোঝায়। অর্থাৎ, রিবা আন-নাসিয়া হচ্ছে ঋণের উপর সময়ের প্রেক্ষিতে ধার্যকৃত অতিরিক্ত অর্থ বা পণ্য। এখানে সময়ের কারনে সুদ বা রিবা আন-নাসি'আ হয়।
যেমন, কেউ যদি কারো কাছ থেকে ১০০ টাকা ঋণ নেয় এবং ১ বছর পর তাকে ১২০ টাকা ফেরত দেয়, তাহলে এই অতিরিক্ত ২০ টাকা রিবা আন-নাসি'আ হবে। আমরা রিবা বা সুদ বলতে সচারচর রিবা আন-নাসি'আ প্রকারের সুদকেই বুঝি। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে সুদের অর্থ আরও ব্যাপক যা দ্বিতীয় প্রকারের সুদ অর্থাৎ রিবা আল ফাদল আলোচনা করলে আরও স্পষ্ট হবে, ইনশা-আল্লাহ।
(খ) রিবা আল ফাদল:
ফাদল অর্থ উত্তম বা ভাল। রিবা আল ফাদল বলতে সমজাতীয় জিনিসের কমবেশী পরিমাণের বিনিময় বুঝায়। অর্থাৎ, কোন দ্রব্যের সাথে একই জাতীয় দ্রব্যের বেশী পরিমাণ বিনিময় করা হলে দ্রব্যের অতিরিক্ত পরিমাণকে বিরা ফদল বলা হয়। এখানে গুণের কারণে সুদ বা রিবা আল ফাদল হয়। উদাহরণস্বরূপ: কেউ যদি কারো কাছ থেকে ১০ কেজি ভাল মানের চাল নিয়ে তার বিনিময়ে অপেক্ষাকৃত খারাপ মানের ১৫ কেজি চাল দেয়, তাহলে অতিরিক্ত এই ৫ কেজি চাল রিবা-ফাদল হবে। এ ক্ষেত্রে আরেকটি শর্ত আছে, আর তা হলো এই সমস্ত জিনিষের বিনিময় নগদে হতে হবে, বাকীতে হলে তা সুদ হিসাবে গণ্য হবে।
রিবায়ে ফযল সম্পর্কে বর্ণিত কতিপয় হাদিস:
১। আবু সাইদ খুদরি রাদীয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,
অর্থ: ‘তোমরা সোনার বদলে সোনা বিক্রি করবে না, একটি অপরটি হতে কম-বেশী করবে না। তোমরা কমবেশি করে রূপার বদলে রূপা বিক্রি করো না, তবে সমান সমান বিক্রি করতে পার। আর এসব জিনিসে বাকির বিনিময়ে নগদে বিক্রি করো না।’ (সহীহ আল বুখারী, হাদীস নং ২১৭৭)
২। আবূ সাঈদ খুদরী ও আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এক ব্যক্তিকে খায়বারে তহসীলদার নিযুক্ত করেন। সে জানীব নামক (উত্তম) খেজুর নিয়ে উপস্থিত হলে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেন, খায়বারের সব খেজুর কি এ রকমের? সে বলল, না, আল্লাহর কসম, হে আল্লাহর রাসূল, এরূপ নয়, বরং আমরা দু' সা' এর পরিবর্তে এ ধরণের এক সা' খেজুর নিয়ে থাকি এবং তিন সা' এর পরিবর্তে দু' সা'। তখন আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, এরূপ করবে না। বরং মিশ্রিত খেজুর দিরহামের বিনিময়ে বিক্রি করে দিরহাম দিয়ে জানীব খেজুর ক্রয় করবে।" (সহীহ আল বুখারী, হাদীস নং ২২০২)
৩। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
অর্থ: "স্বর্ণের সাথে স্বর্ণের বিনিময় যদি উভয় পক্ষ হতে নগদ আদান-প্রদান না হয়, তবে তা সুদের অন্তর্ভুক্ত হবে। গমের সাথে গমের বিনিময় যদি উভয় পক্ষ হতে নগদ (সম-পরিমান) আদান-প্রদান না হয়, তবে তা সুদের অন্তর্ভুক্ত হবে। খেজুরের সাথে খেজুরের বিনিময় যদি উভয় পক্ষ হতে নগদ (সম-পরিমান) আদান-প্রদান না হয়, তবে তা সুদের অন্তর্ভুক্ত হবে। খেজুরের সাথে খেজুরের বিনিময় যদি উভয় পক্ষ হতে নগদ (সম-পরিমান) লেনদেন না হয়, তবে তা সুদের অন্তর্ভুক্ত হবে।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৩৩৪৮)
সুদ হারাম হওয়ার দলিল
কুরআনের বেশ কিছু আয়াত এবং হাদিসে সুদের নিষেধাজ্ঞা স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে যা নিম্নে বর্ণনা করা হলো:
(ক) পবিত্র কুরআনে সুদের উপর নিষেধাজ্ঞা:
১। সুদখোর কখনো সফল হয় না:
এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন,
অর্থ: "হে মুমিনগণ, তোমরা চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ খেও না এবং আল্লাহকে ভয় করো, যেন তোমরা সফল হতে পার।" (সুরা: আলে ইমরান: আয়াত নং ১৩০)
২। যারা সুদ খায় তারা হাশরের ময়দানে শয়তান স্পর্শ করে পাগল বানিয়ে দেয়া ব্যক্তির মত হয়ে উঠবে:
মহান আল্লাহর বাণী,
অর্থ: "যারা সুদ খায়, তারা কিয়ামত দিবসে শয়তান স্পর্শ করে পাগল বানিয়ে দেয়া ব্যক্তির মত হয়ে উঠবে এটা এ জন্য যে, তারা বলে, ব্যবসা তো সুদের মতই। অথচ আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।" (সুরা বাকারা: আয়াত নং ২৭৫)
৩। আল্লাহ তা'য়ালা সুদকে ধ্বংস করেন এবং দানকে বৃদ্ধি করেন:
এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন,
অর্থ: "আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দানকে বৃদ্ধি করেন। আল্লাহ কোনো অকৃতজ্ঞ পাপীকে ভালবাসেন না।" (সুরা বাকারা: আয়াত নং ২৭৬)
৪। সুদ সম্পদ বৃদ্ধি করে না এবং যাকাত সম্পদ বৃদ্ধি করে:
মহান আল্লাহ বলেন,
অর্থ: "মানুষের ধন সম্পদ বৃদ্ধি পাবে, এ আশায় সুদে যা কিছু তোমরা দিয়ে থাক, আল্লাহর দৃষ্টিতে তা বৃদ্ধি পায় না। বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় তোমরা যে জাকাত দিয়ে থাক তা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। প্রকৃতপক্ষে জাকাত প্রদানকারীরাই সমৃদ্ধি আনে।" (সূরা আর-রূম: আয়াত নং ৩৯)
(খ) হাদিসে সুদের উপর নিষেধাজ্ঞা:
১। সুদখোর, সুদ দাতা, সুদের সাক্ষ্যদাতা এবং সুদের লেখক সবার উপর আল্লাহর লানত:
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
অর্থ: "তোমাদের মধ্যে যারা সুদ খায়, সুদ দেয়, সুদের সাক্ষ্য দেয় এবং সুদের হিসাব লেখে তাদের সবার উপর আল্লাহর লানত।" (সুনানে ইবনে মাযাহ: হাদিস নং ২২৭৭, জামে' আত-তিরমিজি: হাদিস নং ১২০৬)
২। সুদের সবচেয়ে ছোট গুণাহ হলো আপন মায়ের সঙ্গে যেনা করার সমান:
(ক) আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
অর্থ: "সুদের গুনাহ ৭০ প্রকার; তন্মধ্যে সবচেয়ে ছোট গুণাহ হলো আপন মায়ের সঙ্গে বিবাহ (যেনা) করা।" (ইবনে মাজাহ: হাদিস নং ২২৭৪)
(খ) আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,
অর্থ: "সুদের তিয়াত্তরটি দরজা বা স্তর রয়েছে। তার মধ্যে সব চাইতে সহজ স্তরটি হলো নিজের মায়ের সঙ্গে জেনা করার সমতুল্য। আর সব চাইতে কঠিন স্তরটি হলো কোন মুসলিম ব্যক্তিকে অপমান-অপদস্ত করা। (মুস্তাদরাকে হাকেম: হাদিস নং ২/৩৭)
৩। সুদের সম্পদ হ্রাসপ্রাপ্ত হয়:
ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,
অর্থ: "সুদের অর্থ দিয়ে যা-ই বৃদ্ধি করুক না কেন, পরিণামে তা হ্রাসপ্রাপ্ত হবেই।" (ইবনে মাজাহ: হাদিস নং ২২৭৯)
৪। সুদের এক দিরহাম ৩৬ বার যেনা করার চেয়েও বড় অপরাধ:
আব্দুল্লাহ ইবনে হানযালা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,
অর্থ: "জেনে বুঝে এক দিরহাম পরিমাণ সুদ খাওয়া ছত্রিশবার যেনা করার চেয়েও বড় অপরাধ।" (মুসনাদে আহমদ : হাদিস নং ৫/২২৫)
৫। কোনো জনপদে সুদের ব্যাপক প্রসার আল্লাহ তায়ালার আযাবের কারণ:
ইবনে আববাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,
অর্থ: "যখন কোনো জনপদে সুদ ও ব্যভিচার ছড়িয়ে পড়ে তখন তারা নিজেদের ওপর আল্লাহর আজাব বৈধ করে নেয়।" (মুস্তাদরাকে হাকেম: হাদিস নং ২/৩৭)
ব্যবসা ও সুদের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য
১। ব্যবসা ও সুদের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। ব্যবসায় মূল্য সৃষ্টি হয় এবং ঝুঁকি ভাগ করে নেওয়া হয়। অন্যদিকে সুদে অন্যায় মুনাফা অর্জন করা হয় এবং সম্পদের অসম বন্টন ঘটে।
২। ইসলামে ব্যবসাকে উৎসাহিত করা হয়েছে এবং সুদকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে । কারণ, ব্যবসা অর্থনীতির জন্য উপকারী এবং সমাজের জন্য কল্যাণকর। আর সুদ অর্থনীতি ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর।
৩। ইসলামে সুদকে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং সুদ গ্রহীতা ও প্রদানকারী উভয়ের জন্যই কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে। অন্যদিকে ব্যবসাকে হালাল ঘোষণা করা হয়েছে এবং ব্যবসার জন্য উৎসাহ দেয়া হয়েছে।
উপসংহার
সুদ অর্থনীতিতে একটি ক্ষতিকারক ও ভয়াবহ নীতি। ইসলামে ব্যবসা হালাল কারণ এটি মূল্য সৃষ্টি করে, ঝুঁকি ভাগ করে নেওয়া হয় এবং অর্থনীতির জন্য উপকারী। অপরদিকে সুদকে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে কারণ এটি অন্যায়, শোষণমূলক, এবং সমাজের জন্য ক্ষতিকর। সুদ সম্পদের উৎপাদনশীল ব্যবহারে বাধা সৃষ্টি করে, ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে দূরত্ব বৃদ্ধি করে, আল্লাহর অধিকারে হস্তক্ষেপ করে এবং নৈতিক ও আধ্যাত্মিক ক্ষতি সাধন করে।
তাই আসুন আমরা সুদকে পুরোপুরিভাবে বর্জন করি এবং ব্যবসার মাধ্যমে ইহকাল ও পরকালে সুখী সমৃদ্ধি জীবন গড়ে তুলি। মহান আল্লাহ আমাদেরকে সেই তাওফীক্ব দান করুন। আমীন।।
0 মন্তব্যসমূহ