নিফাক কাকে বলে? নিফাক কত প্রকার ও কি কি?

নিফাক

নিফাক

ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায়, নিফাক মানে হলো মুখে ঈমানের কথা বলা ও ইসলামের হিতাকাংখী দাবী করা এবং অন্তরে কুফরি ও ইসলাম বিদ্বেষী মনোভাব পোষণ করা। অর্থাৎ, একজন মুনাফিক মুখে নিজেকে মুসলমান হিসেবে জাহির করে, কিন্তু গোপনে সে ইসলাম ও আল্লাহর প্রতি অবিশ্বাসী থাকে। এটি একটি অত্যন্ত গর্হিত কাজ ও তাওহীদের পরিপন্থী বিষয় এবং এর পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। একজন মুনাফিক ব্যক্তি ইসলাম থেকে সম্পূর্ণভাবে বের হয়ে যায়।

 আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে মুনাফিকদের সম্পর্কে এরশাদ করেন,

“নিঃসন্দেহে মুনাফিকরা নাফরমান।“- সূরা আত তাওবা; আয়াত নং ৬৭।

নিফাকের ভয়াবহ পরিণতি

নিফাকের পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। এ বিষয়ে মহান আল্লাহ বলেন,

১। “নিশ্চয়ই মুনাফিকরা জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে থাকবে এবং তুমি তাদের পক্ষে কোনও সাহায্যকারী পাবে না।“- সূরা আন নিসা; আয়াত নং ১৪৫।

২। "মুনাফিকরা আল্লাহ এবং মুমিনদেরকে ধোঁকা দেয়, অথচ তারা নিজেদেরকে ছাড়া অন্য কাউকে ধোঁকা দেয় না, কিন্তু তারা তা উপলব্ধি করতে পারে না।"- সূরা আল-বাকারা; আয়াত নং ৯।

নিফাকের প্রকারভেদ

নিফাক মূলত দুই প্রকার:

১। আক্বিদার নিফাক 

এটি হলো সবচেয়ে বড় ধরনের নিফাক। এই প্রকার নিফাকে ব্যক্তি মুখে ঈমানের দাবি করলেও অন্তরে আল্লাহ, তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম), কুরআন এবং ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলোর প্রতি বিশ্বাস রাখে না। বরং তারা ইসলামকে মিথ্যা মনে করে এবং গোপনে ইসলামের ক্ষতি করার চেষ্টা করে।

আক্বিদার নিফাকের কিছু লক্ষণ:

  • আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করা।
  • ইসলামের বিধি-বিধান ও শরিয়তের প্রতি বিদ্বেষ রাখা।
  • মুসলমানদের ক্ষতিতে আনন্দিত হওয়া এবং তাদের কষ্টে দুঃখিত না হওয়া।
  • ইসলামের উন্নতি ও বিজয় অপছন্দ করা।
  • কাফের ও অবিশ্বাসীদের সাথে গোপনে বন্ধুত্ব রাখা এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাদের সাহায্য করা।

এই প্রকার নিফাকে লিপ্ত ব্যক্তি খাঁটি কাফের এবং চিরস্থায়ী জাহান্নামী।

২। আমলের নিফাক 

এই প্রকার নিফাকে ব্যক্তি ঈমানের মৌলিক বিষয়গুলোর প্রতি বিশ্বাস রাখে, কিন্তু তার কিছু কাজ ও আচরণ মুনাফিকদের মতো হয়। এটি ছোট ধরনের নিফাক এবং ঈমান নষ্ট করে না, তবে এটি একটি গুরুতর গুনাহ এবং ব্যক্তিকে ফাসিক (পাপাচারী) বানিয়ে দেয়। এই প্রকার মুনাফিক ব্যক্তির মধ্যে ঈমান ও নিফাক দুটাই থাকে। এ সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী-

‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আমর (রাযি.) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ চারটি স্বভাব যার মধ্যে বিদ্যমান সে হচ্ছে খাঁটি মুনাফিক। যার মধ্যে এর কোন একটি স্বভাব থাকবে, তা পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত তার মধ্যে মুনাফিকের একটি স্বভাব থেকে যায়। ১) আমানত রাখা হলে খিয়ানত করে; ২) কথা বললে মিথ্যা বলে; ৩) অঙ্গীকার করলে ভঙ্গ করে; এবং ৪) ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হলে অশ্লীলভাবে গালাগালি দেয়। - সহীহ বুখারী; হাদিস নং ৩৪।

সুতরাং আমলের নিফাকের ৪ টি লক্ষণ হচ্ছেঃ

  • যখন কথা বলে মিথ্যা বলে।
  • যখন ওয়াদা করে তা ভঙ্গ করে।
  • যখন আমানত রাখা হয় তখন তা খিয়ানত করে।
  • যখন ঝগড়া করে তখন অশ্লীল ও অন্যায় কথা বলে।

সুতরাং, নিফাক হলো দ্বিমুখী নীতি অবলম্বন করা, যেখানে মুখে এক কথা বলা হয় এবং অন্তরে তার বিপরীত বিশ্বাস রাখা হয়। আক্বিদার নিফাক ঈমান ধ্বংসকারী এবং আমলের নিফাক বড় ধরনের গুনাহের কারণ। প্রত্যেক মুসলমানের উচিত নিফাকের সকল প্রকার থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা।

কাফের ও মুনাফিকের মধ্যে পার্থক্য কি?

কাফের এবং মুনাফিকের মধ্যে মূল পার্থক্য হলো তাদের ঈমানের প্রকাশ এবং অন্তরের বিশ্বাসের ক্ষেত্রে।

কাফের:

  • পরিচয়: কাফের হলো সেই ব্যক্তি যে আল্লাহকে এবং ইসলামকে স্পষ্টভাবে অস্বীকার করে। সে প্রকাশ্যে ঈমানের সাক্ষ্য দেয় না এবং ইসলামের কোনো বিধি-বিধান মানে না।
  • বিশ্বাস: কাফেরের অন্তরে আল্লাহ, তাঁর রাসূল (সাঃ) এবং ইসলামের প্রতি কোনো বিশ্বাস থাকে না। সে তার অবিশ্বাসকে প্রকাশ্যে ঘোষণা করে অথবা তার কাজকর্মের মাধ্যমে তা স্পষ্ট করে তোলে।
  • অবস্থান: কাফের মূলত ইসলামের বাইরে অবস্থান করে।

মুনাফিক:

  • পরিচয়: মুনাফিক হলো সেই ব্যক্তি যে মুখে নিজেকে মুসলমান হিসেবে দাবি করে এবং বাহ্যিকভাবে ইসলামের কিছু রীতিনীতি পালন করে। কিন্তু তার অন্তরে ইসলাম ও আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস থাকে না।
  • বিশ্বাস: মুনাফিকের অন্তরে কুফরি (অবিশ্বাস) লুকিয়ে থাকে। সে লোক দেখানোর জন্য ইসলাম পালন করে এবং গোপনে ইসলামের ক্ষতি করার চেষ্টা করে। তাদের অন্তর তাদের মুখের কথার বিপরীত।
  • অবস্থান: মুনাফিক বাহ্যিকভাবে মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত থাকে, কিন্তু মানসিকভাবে তারা অবিশ্বাসী।

নিফাক থেকে বাঁচার উপায় কি?

নিফাক একটি মারাত্মক আধ্যাত্মিক ব্যাধি, যা একজন মুমিনের ঈমান ও আখিরাতের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। নিফাক থেকে বাঁচার জন্য আন্তরিক প্রচেষ্টা ও আল্লাহর সাহায্য কামনা করা অপরিহার্য। নিচে কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপায় আলোচনা করা হলো:

১. আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে দু'আ করা:

নিফাকের ক্ষতি থেকে একমাত্র আল্লাহই রক্ষা করতে পারেন। তাই সর্বদা আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে দু'আ করা উচিত, যেন তিনি আমাদের অন্তরকে নিফাকের কালিমা থেকে মুক্ত রাখেন এবং সরল পথে অবিচল রাখেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) নিজেও বিভিন্ন দু'আ করতেন এবং সাহাবাদেরকেও দু'আ করতে উৎসাহিত করতেন।

 

নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দ্বীনের ওপর অটল থাকতে এই দোয়া বেশি বেশি পাঠ করতেন—

উচ্চারণ: ‘ইয়া মুক্বাল্লিবাল ক্বুলুব, ছাব্বিত ক্বালবি ‘আলা দ্বীনিক।’ অর্থ: ”হে অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী! আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের উপর সুদৃঢ় রাখুন।”- তিরমিজি, হাদিস : ৩৫২২।

২. কুরআন ও সুন্নাহর জ্ঞান অর্জন করা:

কুরআন ও সুন্নাহর সঠিক জ্ঞান নিফাকের স্বরূপ বুঝতে এবং তা থেকে বেঁচে থাকতে সাহায্য করে। যখন একজন মুমিন নিফাকের লক্ষণ ও পরিণতি সম্পর্কে অবগত হবে, তখন সে অবশ্যই তা থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করবে। নিয়মিত কুরআন তেলাওয়াত করা, এর অর্থ বোঝা এবং রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর হাদিস অধ্যয়ন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

৩. নিজের নিয়ত ও আমলকে পরিশুদ্ধ করা:

প্রত্যেকটি কাজ একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা উচিত। লোক দেখানো বা অন্য কোনো জাগতিক উদ্দেশ্যে কোনো আমল করা নিফাকের একটি অংশ। তাই সর্বদা নিজের নিয়তকে পরিশুদ্ধ করার চেষ্টা করতে হবে এবং ইখলাসের সাথে আমল করতে হবে।

৪. মুনাফিকদের সঙ্গ ত্যাগ করা:

খারাপ সঙ্গ মানুষের উপর খারাপ প্রভাব ফেলে। মুনাফিকদের সাথে মেলামেশা করলে তাদের স্বভাব ও চিন্তাভাবনা নিজের মধ্যেও সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই যারা প্রকাশ্যে বা গোপনে ইসলাম ও মুসলমানদের ক্ষতি চায়, তাদের সঙ্গ ত্যাগ করা উচিত।

৫. নিজের ত্রুটি ও দুর্বলতা সম্পর্কে সচেতন থাকা:

মানুষ হিসেবে আমাদের মধ্যে ভুলত্রুটি থাকা স্বাভাবিক। তবে নিজের ভুল ও দুর্বলতা সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং তা সংশোধনের চেষ্টা করা জরুরি। যখন কোনো ব্যক্তি নিজের মধ্যে নিফাকের কোনো লক্ষণ দেখতে পায়, তখন দ্রুত তওবা করা উচিত এবং তা থেকে পরিত্রাণের জন্য আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া উচিত।

৬. গোপনে নেক আমল করা:

গোপনে নেক আমল করা নিফাক থেকে বাঁচার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। যখন একজন ব্যক্তি লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে কোনো আমল করে না, বরং একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য গোপনে ইবাদত করে, তখন তার অন্তরে ইখলাস সৃষ্টি হয় এবং নিফাকের প্রবণতা কমে যায়।

৭. আত্মসমালোচনা করা (মুহাসাবা):

প্রতিদিন ঘুমানোর আগে নিজের কৃতকর্মের হিসাব নেওয়া উচিত। সারাদিনে কোনো ভুল বা ত্রুটি হয়ে থাকলে তার জন্য অনুতপ্ত হওয়া এবং ভবিষ্যতে তা পরিহার করার প্রতিজ্ঞা করা উচিত। আত্মসমালোচনা একজন মুমিনকে সর্বদা সতর্ক রাখে এবং নিফাকের পথ থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করে।

৮. আল্লাহর জিকির ও স্মরণ:

আল্লাহর জিকির অন্তরের প্রশান্তি দান করে এবং শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে রক্ষা করে। নিয়মিত আল্লাহর জিকির করা, তাসবিহ পাঠ করা এবং কুরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে অন্তরকে আল্লাহর স্মরণে জীবিত রাখা নিফাক থেকে বাঁচার অন্যতম উপায়।

পরিশেষে বলা যায়, নিফাক থেকে বাঁচতে হলে একজন মুমিনকে সর্বদা সচেষ্ট থাকতে হবে, আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে হবে এবং কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশিকা অনুসরণ করে জীবনযাপন করতে হবে। আন্তরিক প্রচেষ্টা এবং আল্লাহর রহমতই আমাদেরকে এই ভয়াবহ ব্যাধি থেকে মুক্তি দিতে পারে।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ