
ভূমিকা
মানুষ মাত্রই তার কোন না কোন আত্মীয়-স্বজন অবশ্যই রয়েছে। এই আত্মীয়-স্বজনদের সাথে সুন্দর আচরণ করাঈবং তাদের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে ইহকালে যেমন সুখ-শান্তি লাভ করা যায়, তেমনি আখিরাতেও জান্নাত পাওয়ার জন্য অত্যন্ত জরূরী ভূমিকা পালন করে। তাই আত্মীয়তার সম্পর্ক সুদৃঢ় ও অটুট রাখার জন্য সর্বদাই সচেষ্ট থাকতে হবে।
অপরদিকে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার ফলে মানুষের জীবনে নেমে আসে লাঞ্ছনা, দুশ্চিন্তা, বিষন্নতা এবং মহাপেরেশানী। তাই আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা শরীয়তের দৃষ্টিতে যেমন মারাত্মক অপরাধ তেমনি জান্নাতে যাওয়ার পথে বড় বাধার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বর্তমান সমাজে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার পাপ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে যা থেকে আমাদেরকে বের হওয়ার জন্য সাধ্যমত চেষ্টা করতে হবে। এর জন্য যা জরূরী তা হচ্ছে দ্বীনের সঠিক ইলম হাসিল করা যার মাধ্যমে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করার গুরুত্ব ও ফযীলত জানা ও তা নিজ জীবনে বাস্তবায়্ন করার জন্য অনেক বড় সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার গুরুত্ব ও ফযীলত
আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করার গুরুত্ব ও ফযীলত অনেক। নীচে তার কয়েকটি পবিত্র কুরআন ও সহীহ হাদিসের আলোকে উল্লেখ করা হলো:
১। যারা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে তাদের প্রতি আল্লাহর লা'নত বা অভিসম্পাত রয়েছে:
মহান আল্লাহ বলেন,
অর্থ: "আর যারা আল্লাহর সাথে দৃঢ় অঙ্গীকারে আবদ্ধ হওয়ার পর তা ভঙ্গ করে, যে সম্পর্ক অক্ষুন্ন রাখতে আল্লাহ আদেশ করেছেন তা ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে বেড়ায়, তাদের জন্য রয়েছে লা'নত এবং তাদের জন্য রয়েছে পরকালে মন্দ আবাস।" (সূরা আর-রা'দ, আয়াত নং ২৫)
২। আল্লাহ তা'য়ালা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারীদেরকে নিন্দা করেছেন:
মহান আল্লাহ বলেন,
অর্থ: "সুতরাং ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে সম্ভবত তোমরা যমীনে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করবে। এরাই তারা, যাদেরকে আল্লাহ অভিশপ্ত করেছেন, ফলে তিনি তাদেরকে বধির ও দৃষ্টিশক্তিহীন করেন।" (সূরা মুহাম্মদ, আয়াত নং ২২-২৩)
৩। আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা মু'মিনের বৈশিষ্ট:
আবু হুরাইরাহ্ রাদ্বীয়াল্লাহু তা'য়ালা আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
অর্থ: "যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী সে যেন তার আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে।" (বুখারী, হাদীস নং ৬১৩৮)
৪। আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করলে রিযিক ও বয়সে বরকত হয়:
আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বলতে শুনেছি,
অর্থ: "যে লোক তার জীবিকা (রিজিক) প্রশস্ত করতে চায় এবং আয়ু বৃদ্ধি করতে চায়, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে"। (বুখারী, হাদিস নং ৫৯৮৫)
৫। আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা জান্নাতে যাওয়ার অন্যতম একটা মাধ্যম:
আবু আইয়ুব আনসারী রাদ্বীয়াল্লাহু তা'য়ালা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
অর্থ: এক ব্যক্তি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট এসে বলল: হে আল্লাহর রাসূল, আমাকে এমন একটি আমল বলে দিন যা আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, "তুমি আল্লাহর ইবাদাত করবে, তাঁর সঙ্গে কাউকে শরীক করবে না, সালাত কায়েম করবে, যাকাত আদায় করবে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করবে (তাহলে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে)"। (বুখারী, হাদীস নং ৫৯৮৩)
৬। আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে যাবে না:
এই মর্মে হাদীস-
(ক) জুবাইর বিন মুত্ব'ইম রাদ্বীয়াল্লাহু তা'য়ালা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বলতে শুনেছেন,
অর্থ: "আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না" (বুখারী, হাদীস নং ৫৯৮৪; তিরমিযী, হাদিস নং ১৯০৯; আবু দাউদ, হাদীস নং ১৬৯৬)
(খ) আবু মূসা রাদ্বীয়াল্লাহু তা'য়ালা আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
অর্থ: "তিন ব্যক্তি জান্নাতে যাবে না: যে মদ্যপানে অভ্যস্ত, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী এবং যাদুতে বিশ্বাসী।" (আহমাদ, হাদীস নং ১৯৫৮৭; ইবনে হিব্বান, হাদিস নং ৫৩৪৬)
৭। আল্লাহ তা'য়ালা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারীর শাস্তি দুনিয়াতেও দেন:
আবু বাকরাহ রাদ্বীয়াল্লাহু তা'য়ালা আনহু থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
অর্থ: "দু'টি গুনাহ্ ছাড়া এমন কোন গুনাহ্ নেই যে গুনাহ্গারের শাস্তি আল্লাহ তা,য়ালা দুনিয়াতেই দেন; উপরন্ত তার জন্য আখিরাতের শাস্তি তো আছেই। গুনাহ্ দু'টি হচ্ছে: (ন্যায়পরায়ণ শাসকের বিরুদ্ধে) বিদ্রোহ ও আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী।" (আবু দাউদ, হাদিস নং ৪৯০২; তিরমিযী, হাদীস নং ২৫১১)
৮। আত্মীয়-স্বজনদেরকে সাদাকা করলে দু'টি সাওয়াব পাওয়া যায়:
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদ্বীয়াল্লাহু তা'য়ালা আনহু এর স্ত্রী যায়নাব রাদ্বীয়াল্লাহু তা'য়ালা আনহা থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন, একদা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মহিলাদেরকে সাদাকা করার উপদেশ দিলেন। অতঃপর নিজ স্বামীদেরকেও সাদাকা করা যাবে কিনা সে ব্যাপারে তিনি বিলাল রাদ্বীয়াল্লাহু তা'য়ালা আনহু এর মাধ্যমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন,
অর্থ: "তার জন্য দু'টি সাওয়াব: একটি আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করার সাওয়াব এবং অপরটি সাদাকার সাওয়াব।" (বুখারী, হাদিস নং ১৪৬৬)
উপসংহার
আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করার গুরুত্ব অপরিসীম। আল্লাহ তা'য়ালা পবিত্র কুরআনে এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সহীহ হাদীসে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করার উপর অত্যন্ত গুরুত্ব আরোপ করেছেন এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার বিরুদ্ধে কঠোর হুশিয়ারী বাণী উচ্চারণ করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, "অন্ততপক্ষে সালাম বিনিময়ের মাধ্যমে হলেও তোমরা তোমাদের আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করো।" (বায্যার, হাদীস নং ১৮৭৭)
আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা বলতে শধু এতটুকু বুঝায় না যে, কোন আত্মীয় ভাল ব্যবহার করলে তার সাথে ভাল ব্যবহার করা; বরং তারা খারাপ ব্যবহার করার পরও যদি ভাল ব্যবহার করা হয়, তাহলে বুঝতে হবে যে, তিনি আত্মীয়তার সম্পর্ক সঠিক ভাবে রক্ষা করছেন। এই বিষয়ে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, "আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকারী ঐ ব্যক্তি নয় যে সমান সমান ব্যবহার করে, বরং আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকারী সেই ব্যক্তি যার সাথে কোন আত্মীয় সম্পর্ক ছিন্ন করলেও সে তার সাথে সম্পর্ক রক্ষা করে।" (বুখারী, হাদীস নং ৫৯৯১; আবু দাউদ, হাদীস নং ১৬৯৭; তিরমিযী, হাদীস নং ১৯০৮)
তবে সব সময় একটা বিষয় মনে রাখতে হবে যে, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করার উদ্দেশ্যই হবে একমাত্র মহান রবের সন্তুষ্টি। আল্লাহ আ'য়ালা আমাদের সকলকে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে বেঁচে থাকার এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক সুদৃরভাবে রক্ষা করার তাওফীক দান করুন।
0 মন্তব্যসমূহ