
ঈমান কাকে বলে?
'ঈমান'
একটি আরবি শব্দ যার
আভিধানিক অর্থ হলো দৃঢ়
বিশ্বাস করা।
ইসলামী
পরিভাষায় ঈমান হলো:
১। অন্তরে দৃঢ়
বিশ্বাস
স্থাপন
করা:
আল্লাহ তা'আলার অস্তিত্ব,
একত্ব, তাঁর গুণাবলী, ফেরেশতাগণ,
আসমানী কিতাবসমূহ, সকল নবী-রাসূলগণ,
শেষ দিবস (কেয়ামত), এবং তাকদিরের ভালো-মন্দের প্রতি অন্তরে দৃঢ় বিশ্বাস রাখা।
২। মুখে স্বীকার
করা:
অন্তরের এই বিশ্বাসকে মুখে
স্বীকার করা বা ঘোষণা
করা।
৩। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ
দ্বারা
বাস্তবায়ন
করা:
ঈমানের দাবি অনুযায়ী জীবনযাপন
করা, অর্থাৎ ইবাদত ও সৎ আমল
করা।
সংক্ষেপে,
ঈমান হলো আল্লাহ এবং
তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)
যা কিছু আদেশ করেছেন,
সেগুলোর ওপর দৃঢ় বিশ্বাস
স্থাপন করা এবং সেই
অনুযায়ী আমল করা। অর্থাৎ,
ঈমান শুধু মুখে বলা
নয়; অন্তরে বিশ্বাস, মুখে স্বীকৃতি এবং
আমলে প্রতিফলন—এই তিনটি বিষয়ের
সম্মিলনই ঈমান। ঈমান সৎকাজের দ্বারা বাড়ে এবং অসৎকাজের দ্বারা
কমে।
হাদীসের আলোকে ঈমানের সংজ্ঞা:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন (হাদীসে-এ জিবরাইল 'আলাইহিসসালাম):
“ঈমান
হলো, তুমি আল্লাহর ওপর,
তাঁর ফেরেশতাগণের ওপর, তাঁর কিতাবসমূহের
ওপর, তাঁর রাসূলগণের ওপর,
আখিরাতের ওপর, এবং তাকদিরের
(ভাগ্যের) ওপর বিশ্বাস করো—সেটা ভালো হোক
বা মন্দ হোক।”
- সহীহ
মুসলিম: হাদীস নং ১।
ঈমান ভঙ্গকারী বিষয়গুলো
ঈমান
ভঙ্গকারী বিষয়গুলোর মধ্যে কিছু আছে মৌখিক,
কিছু বিশ্বাসগত এবং কিছু আচরণগত,
যা একজন মুসলমানকে ইসলামের
গণ্ডি থেকে বের করে
।
ঈমান ভঙ্গের
কারণগুলোকে
প্রধানত
তিন
ভাগে
ভাগ
করা
যায়:
১। বিশ্বাসগত কারণ:
(ক) আল্লাহর সাথে
শিরক
করা:
আল্লাহর সাথে কাউকে অংশীদার
স্থাপন করা। যেমন, আল্লাহ
ছাড়া অন্য কারো কাছে
সাহায্য চাওয়া, সিজদা করা, কবরে সিজদা
করা বা কোনো মৃত
ব্যক্তি বা পীরের কাছে
এমন কিছু চাওয়া যা
কেবল আল্লাহই দিতে পারেন।
(খ) আল্লাহ বা
তাঁর
রাসূল
(সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর কোনো বিধানকে
অস্বীকার করা: ইসলামের কোনো ফরজ বা
ওয়াজিব বিধানকে অপছন্দ করা বা অস্বীকার করা। যেমন, সালাত,
রোজা, হজ্জ্ব বা যাকাতকে অর্থহীন
মনে করা বা জান্নাত-জাহান্নাম, কিয়ামত, ফেরেশতা বা তাকদিরে বিশ্বাস
না করা বা এর
গুরুত্ব অস্বীকার করা।
(গ) আল্লাহর প্রতি
সন্দেহ
পোষণ
করা:
আল্লাহ তা'আলার কোনো
আদেশ বা তাঁর পাঠানো
কোনো কিতাব (কুরআন) বা রাসূলের (সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কোনো
নির্ভরযোগ্য সংবাদ সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করা। যেমন, কেউ
যদি বলে, "হয়তো ইসলামই সত্য,
কিন্তু আমি নিশ্চিত নই",
এইরূপ সন্দেহ ঈমানের পরিপন্থী।
(ঘ) হারামকে হালাল
মনে
করা:
ইসলামে যেসব বিষয় সুস্পষ্টভাবে
হারাম করা হয়েছে, সেগুলোকে
জেনে বুঝে হালাল মনে
করা যেমন: ব্যভিচার, সুদ, মদ, শুকরের
মাংস ইত্যাদি।
(ঙ) মুশরিক-কাফিরদের
কুফুরিকে
কুফুরি
মনে
না
করা:
কাফির বা মুশরিকদেরকে কাফির-মুশরিক মনে না করা
অথবা তাদের মতবাদকে সঠিক মনে করা।
ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো
ধর্মকে মুক্তির পথ মনে করা।
যেমন বলা, “সব ধর্মই ঠিক”
এমন বিশ্বাস করলে ঈমান নষ্ট হয়ে
যায়।
(চ) হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর রিসালাত অস্বীকার
করা:
তাঁকে শেষ নবী ও
রাসূল হিসাবে অস্বীকার করা বা তাঁর
পরে কোনো নবী আসার
ধারণা পোষণ করা।
(ছ) তাগুতকে বিচারক
মানা:
আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের
ফয়সালার পরিবর্তে অন্য কোনো আইন
বা মানুষের তৈরি বিধানকে উত্তম
মনে করা এবং তা
অনুযায়ী বিচার বা ফয়সালা চাওয়া।
২। কর্মগত কারণ:
(ক) আল্লাহ ছাড়া
অন্যের
জন্য
পশু
জবাই
করা:
রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)
বা কোনো পীর-বুজুর্গের
নামে পশু জবাই করা।
(খ) কাফিরদের সাহায্য-সহযোগিতা
করা:
মুসলিমদের বিরুদ্ধে কাফিরদের সাহায্য-সহযোগিতা করা।
(গ) কুরআন ও
হাদিসের
প্রতি
অসম্মান
দেখানো:
কুরআনের আয়াত বা রাসূলের (সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাদিস,
নামাজ ইত্যাদি উপহাস করা বা তার
অবমাননা করা।
(ঘ) ইসলাম থেকে
মুখ
ফিরিয়ে
নেওয়া:
আল্লাহ মনোনীত দ্বীন ইসলাম থেকে সম্পূর্ণরূপে মুখ
ফিরিয়ে নেওয়া, এর প্রতি উদাসীন
হওয়া এবং এর বিধানগুলো
পালনে চরম অনীহা দেখানো।
(ঙ) ধর্ম ত্যাগ বা ইসলাম থেকে ফিরে যাওয়া: ইচ্ছাকৃতভাবে ইসলাম ত্যাগ করা বা অন্য ধর্ম গ্রহণ করা।
৩। উক্তিগত কারণ:
(ক) আল্লাহ, তাঁর
আয়াত
বা
রাসূল
(সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ
করা:
আল্লাহ, কুরআন বা রাসূল (সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে
নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপমূলক কথা বলা।
(খ) রাসূলুল্লাহ ﷺ এর
কোনো
নির্দেশ
বা
সুন্নাহকে
অবজ্ঞা
করা:
যেমন, দাড়ি রাখা বা পায়ের টাখনুর
উপরে প্যান্ট বা পায়জামা পরিধান করা নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা।
এই কারণগুলো অত্যন্ত সংবেদনশীল, এবং এর প্রতিটি একজন ব্যক্তির ঈমানকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত, এমনকি ঈমান ভঙ্গ করতে পারে। একজন মুসলমানকে অবশ্যই এই বিষয়গুলো সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে এবং নিজেকে ঈমান ভঙ্গের কারণ থেকে দূরে রাখতে হবে।
ঈমান বৃদ্ধি করার করণীয় বিষয়সমূহ:
ঈমান
বৃদ্ধি করার অনেক উপায়
রয়েছে। নিচে কিছু গুরুত্বপূর্ণ
উপায় উল্লেখ করা হলো:
১। আল্লাহর
পরিচয় ও গুণাবলী অর্থাৎ তাওহীদ সম্পর্কে
জ্ঞান অর্জন: আল্লাহর সুন্দর নামসমূহ (আসমাউল হুসনা) জানা, অর্থ বোঝা এবং
তা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা ঈমানকে শক্তিশালী
করে। আল্লাহর বড়ত্ব ও মহিমা সম্পর্কে
জ্ঞান যত বাড়বে, ঈমান
তত সূদৃঢ় হবে।
২। কুরআন
তেলাওয়াত ও গবেষণা: নিয়মিত
কুরআন তেলাওয়াত করা, এর অর্থ
বোঝা এবং আয়াতগুলো নিয়ে
গভীরভাবে চিন্তা করা ঈমান বৃদ্ধির
অন্যতম প্রধান উপায়। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
"যখন তাদের সামনে কুরআনের আয়াত তেলাওয়াত করা হয়, তখন
তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায়।"
- সূরা আনফাল; আয়াত নং- ২।
৩। নবী
(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)
ও সাহাবায়ে কেরামের জীবনী অধ্যয়ন: মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)
এর সিরাত এবং সাহাবায়ে কেরামের
জীবন সম্পর্কে জানা ঈমানকে শক্তিশালী
করে। তাঁদের ত্যাগ, ধৈর্য, এবং আল্লাহর প্রতি
অবিচল আস্থা আমাদের জন্য আদর্শ।
৪। বেশি
বেশি আল্লাহর জিকির করা: আল্লাহর স্মরণ
বা জিকির অন্তরকে প্রশান্ত করে এবং ঈমানকে
মজবুত করে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, "যারা
ঈমানদার এবং যাদের অন্তর
আল্লাহর জিকির দ্বারা শান্তি লাভ করে। জেনে
রেখো, আল্লাহর জিকির দ্বারাই চিত্ত প্রশান্তি পায়।" - সূরা আর-রাদ:
আয়াত নং- ২৮।
৫। সৎ
আমল বৃদ্ধি করা: বেশি বেশি
সৎ কাজ করা ঈমান
বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
সালাত, সাওম, হজ্ব, যাকাত, দান-সাদকা, এবং
অন্যান্য নেক আমল ঈমানকে
সতেজ রাখে।
৬। আল্লাহর
সৃষ্টি নিয়ে চিন্তাভাবনা: মহাবিশ্বের সৃষ্টি, আকাশ-পৃথিবী, মানুষ
এবং অন্যান্য সৃষ্টির মধ্যে আল্লাহর নিদর্শনগুলো নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা আল্লাহর কুদরত
ও মহিমা উপলব্ধি করতে সাহায্য করে,
যা ঈমানকে শক্তিশালী করে।
৭। সৎ
সঙ্গ অবলম্বন করা: এমন লোকদের
সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলা, যাদের
সংস্পর্শে গেলে আমল ও
ঈমান বাড়ে এবং যারা অন্যকে
আমলের প্রতি উৎসাহিত করেন।
৮। সৎকাজের
আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ:
সৎকাজের আদেশ দেওয়া এবং
অসৎকাজ থেকে নিষেধ করাও
ঈমান বৃদ্ধির একটি আমল। এটি
নিজের ভেতরে সৎকাজের উৎসাহ জাগায় এবং অসৎকাজের প্রতি
ঘৃণা তৈরি করে।
৯। বেশি
বেশি দোয়া করা: আল্লাহর কাছে
হেদায়েতের ওপর অটল থাকার
এবং ঈমানকে মজবুত করার জন্য বেশি
বেশি দোয়া করা উচিত। রাসূল ﷺ সবসময়
এই দোয়া করতেন:
“ইয়া মুকাল্লিবাল
ক্বলুব ছাব্বিত ক্বালবী আলা দীনিকা”।
অর্থঃ “হে অন্তর
পরিবর্তনকারি! আমার অন্তরকে আপনি আপনার দ্বীনের উপর সুদৃঢ় রাখুন”। - জামে’ আত-তিরমিজি,
হাদিস নং: ৩৫২২।
১০। মৃত্যু
ও আখিরাত নিয়ে চিন্তা করা: মৃত্যু এবং
আখিরাতের পরিণতি সম্পর্কে চিন্তা করা মানুষকে দুনিয়ার
প্রতি অনাসক্ত করে তোলে এবং
আল্লাহর প্রতি ঈমানকে আরও দৃঢ় করে।
১১। বাড়িতে
ঈমানি পরিবেশ গঠন: পরিবারের সবাইকে
নামাজ-রোজায় অভ্যস্ত করা এবং ছোটবেলা থেকেই
তাওহীদ, কুরআন ও ইসলাম সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া।
এই আমলগুলো নিয়মিতভাবে পালনের মাধ্যমে একজন মুমিন তার
ঈমানকে শক্তিশালী ও সতেজ রাখতে
পারে।
উপসংহার:
ঈমান হচ্ছে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। এটির হেফাজত না করলে, কোনো ইবাদতই কবুল হবে না। ঈমান মানুষকে মুসলমান বানায় এবং এর মাধ্যমেই একজন মু’মিনের জান্নাতে প্রবেশের অধিকার অর্জিত হয়। যারা ঈমান ভঙ্গকারী বিষয়গুলো এড়িয়ে চলে, তারা ইসলামের সরল-সঠিক পথে থাকে। তাই, ঈমান রক্ষায় সচেতন থাকা, নিয়মিত ইলম অর্জন করা এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া আমাদের নিত্যদিনের দায়িত্ব ও অপরিহার্য কর্তব্য।
0 মন্তব্যসমূহ